প্রকাশ: ০১:৪৩:০০ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৮
আ.লীগে হাসানাত, বিএনপির কে?

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বরিশালের- ১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছে।

এই আসনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে গণসংযোগ করছেন দলটির নেতারা। একই সঙ্গে তারা দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিভিন্ন সড়কের মোড়ে এবং দর্শনীয় স্থানে ব্যানার ও ফেস্টুন স্থাপন করেছেন।

তবে বিএনপিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে এ জেলায় অনেকটা কোণঠাসা দলটি। হামলা-মামলা আর কারাবাসে দলীয় নেতারা পর্যুদস্ত। কারাগার আর আদালতে ঘোরাঘুরি করেই বেশির ভাগ সময় পার করেছেন নেতাকর্মীরা। এছাড়া দলীয় কোন্দলে জর্জরিত দলটি। দলের মনোনয়ন পেতে মাঠে রয়েছেন অন্তত চার জন নেতা। এসবের মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে জামায়াত। জোটগতভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে বরিশাল-১ আসনটি বিএনপির কাছে চাইবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানো দল জামায়াতে ইসলামী। সব মিলিয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে কঠিন সময় পার করছে বিএনপি।

বসে নেই জাতীয় পার্টিও (এরশাদ)। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে জাতীয় পার্টি এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বরিশাল-১ আসনে প্রার্থী প্রায় প্রায় চূড়ান্ত করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৎপরতা চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে এবারও আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের একক প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তিনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে নিহত আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে জয়ের পর তিনি চিফ হুইপ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক জহির উদ্দিন স্বপনের কাছে পরাজিত হন। পরাজয়ের পর ওই রাতেই বরিশাল ছাড়েন আবুল হাসানাত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। এর দুটিতে ৩৩ বছরের কারাদণ্ডাদেশ হয়। এ কারণে নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি।

নবম সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলো প্রত্যাহার হলে হাসানাত বরিশালে ফেরেন ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর। ২০১৪ সালের বিএনপি বিহীন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। এরপর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। শুধু বরিশাল জেলা বা মহানগর নয়, বিভাগের ৬ জেলায় থাকা ২১টি নির্বাচনী এলাকা আর প্রায় সব উপজেলা-পৌরসভাতেই রয়েছে তার এক আধিপত্য। নেতাকর্মীদের মতে, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এখন আওয়ামী লীগের বরিশাল অঞ্চলের অভিভাবক।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর তিন ছেলের মধ্যে বড় সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। ছেলের মনোনয়ন থেকে নির্বাচনে বিজয়ের নেপথ্যে ছিলেন আবুল হাসানাত। অন্য দুই ছেলের একজন আশিক আবদুল্লাহ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং আরেক ছেলে মঈন আবদুল্লাহ থাকেন ঢাকায়। তিনিও দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর স্ত্রী সাহান আরা আবদুল্লাহ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। এক কথায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ দুটিই এখন হাসানাত পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। ফলে বরিশাল-১ আসন থেকে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বিপক্ষে দলে বা মহাজোটে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেই বলে তার অনুসারীরা দাবি করছেন।

তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনে তীব্র আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে তা প্রকাশ করতে পারছেন না আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের শরিক দলের অনেকেই।

গৌরনদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র হারিছুর রহমান হারিছ বলেন, এই আসনে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামী লীগের অভিভাবক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে দল অনেক সুসংগঠিত। জনসমর্থনের দিক দিয়ে তার ধারের কাছেও নেই কেউ।

বিএনপি

অন্যদিকে বরিশাল-১ আসনে বিএনপি নেতাকর্মীরা দলীয় কোন্দলে জর্জরিত। কয়েক দশক ধরে চলতে থাকা কোন্দল ও বিভক্তির সমাধান হয়নি এখনও। দলীয় কোন্দলের কারণে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সভাপতি ভাষা সৈনিক কাজী গোলাম মাহাবুব। ১৯৯৩ সালে বিএনপিতে যোগদান করেন জহির উদ্দিন স্বপন। ১৯৯৬ সালে এ আসনে ফের মনোনয়ন পান কাজী গোলাম মাহবুব। তবে জহির উদ্দিন স্বপন মনোনয়ন না পেয়ে তার সমর্থকদের নিয়ে নিজ দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরোধিতা শুরু করেন। বিরোধিতার কারণে কাজী গোলাম মাহবুব আবুল হাসনাত আবদুল্লার কাছে পরাজিত হন।

২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপির মনোয়ন পান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। অপরদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলানোর কারণে জহির উদ্দিন স্বপনকে দল থেকে দেয়া হয়নি মনোনয়ন। মনোনয়ন না পেয়ে এই নির্বাচনে নিজ অনুসারীদের নিয়ে প্রকাশ্যে সোবাহানের বিরোধিতা করেন জহির উদ্দিন স্বপন। দলীয় কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুসের কাছে বিএনপি প্রার্থী আব্দুস সোবাহান পরাজিত হন।

মামলা-হামলায় কোণঠাসা দলটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিভক্তি আরও প্রকট হয়েছে। তৃণমুলে কয়েক ভাগে বিভক্ত এ দলটির মনোনয়নের জন্য লড়ছেন অন্তত চারজন নেতা। এরা হলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল ও সংস্কারপন্থী হিসেবে দলের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন।

বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ জানান, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। প্রার্থীরা দলের নেত্রীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই আসনে অন্য যে কোনো দলের চেয়ে ভোটার ও জনসমর্থনে বিএনপি এগিয়ে। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপির জয় নিশ্চিত।

দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় দল হিসেবে একটু মতভেদ থাকতেই পারে। তবে এতে ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না। ভোটের আগে সব মতভেদ দূর হয়ে যাবে।

এদিকে জোটগতভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে গৌরনদী-আগৈলঝাড়া আসনে প্রার্থী দিবে জামায়াতে ইসলামী। এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানো দলটি তাদের প্রার্থীও চূড়াস্ত করেছেন। দলটির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে জোটের সমর্থন নিয়ে তাদের দলীয় প্রার্থী পশ্চিম জেলা কমিটির মজলিসে শুরা ও কর্ম পরিষদের সদস্য হাফেজ কামরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

জাতীয় পার্টি (এরশাদ)

অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বরিশাল-১ আসনে প্রার্থী প্রায় প্রায় চূড়ান্ত করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে জাপার মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৎপরতা চালাচ্ছেন ।

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) বরিশাল জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, এ আসনে সম্ভাব্য প্রর্থী তালিকায় রয়েছেন- কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মালয়েশিয়া শাখার সভাপতি সোহেল পারভেজ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট সেকান্দার মিয়া, আগৈলঝাড়া উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হারুন আর রশিদ রানা এবং গৌরনদী উপজেলার সভাপতি ইউনুস বেপারী।

অপরদিকে বরিশাল-১ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইসলামী আন্দোলন বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো. সিরাজ জানান, বরিশাল-১ আসনে মেহেদি হাসান রাসেলকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি দলের আগৈলঝাড়া উপজেলা সভাপতি। নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসমর্থন আদায়ে এ আসনে দলের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।