প্রকাশ: ০৮:৫৩:০০ পিএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮
ভোট দেয়া হলো না রেমিটেন্স যোদ্ধাদের

প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচনের সাত মাস আগে স্মারকলিপি দেয়ার পরও বিদেশ থেকে ভোট দিতে পারলেন না প্রবাসীরা।

নির্বাচন কমিশনের খামখেয়ালিতে ভোট দেয়া হলো না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ সমিতির (প্রবাকস) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দেওয়ান বজলু চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের বিষয়ে সিইসি মহোদয় আন্তরিক হলেও কমিশনের নিচের দিকের কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে প্রবাসীরা এবারও ভোট দিতে পারলেন না। ২৩ মে ২০১৮ প্রবাকসের প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীরা যাতে ভোট দিতে পারে, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে স্মারকলিপি দেন। ওই সময় সিইসি বলেছেন, বিদ্যমান আইনে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট দেয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে গত ৩০ নভেম্বর পররাষ্ট্র সচিবকে দেয়। এরপর প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ সমিতি বিশ্বব্যাপী প্রচারণায় নামে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বিদেশ থেকে কয়েক হাজার প্রবাসী ভোটার ভোট দিতে বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং অফিসারের নিকট পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে আবেদন করে। কিন্তু আবেদনকারী কারো কাছেই ব্যালট পেপার পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে আবেদন করেছিলেন আরব আমিরাত প্রবাসী মৌলভীবাজারের খলিলুর রহমান। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. তোফায়েল ইসলাম চিঠিতে পোস্টাল ব্যালটের আবেদন নাকচ করেছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ২৭ অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার ১৫ দিনের মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে রিটার্নিং অফিসারের নিকট আবেদন করতে পারবেন।

খলিলুর রহমান ১৯ ডিসেম্বর আবেদন করেছেন। গত ১২ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালটে আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়েছে ২৭ নভেম্বর ২০১৮। বিলম্বে আবেদনের কারণে পোস্টাল ব্যালট প্রেরণের সুযোগ নেই বলে ওই চিঠিতে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেছেন।

এ ব্যাপারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কলরেডির চেয়ারম্যান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অধ্যাপক ড. মিলটন হাসনাৎ বলেন, প্রবাসীদের ভোট দিতে না পারার দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। তারা কোনো রকম ক্যাম্পেইন করেনি।

চীন থেকে প্রবাসী ছাত্র সৈকত সরকার বলেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পাবনা জেলা প্রশাসকের নিকট ব্যালট পেপার পাঠাতে আবেদন করেছিলাম। অনেক ইচ্ছে ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবো। কিন্তু ভোট দিতে পারলাম না।

কাতার প্রবাসী মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের ভোটার। পোস্টাল ব্যালট না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আমরা এক কোটি প্রবাসী বিদেশ থেকে ভোট দিতে চাই। সেজন্য যা কিছু করা দরকার নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে। প্রবাসীদের কাছ থেকে শুধু রেমিটেন্স নেবেন কিন্তু ভোট দিতে দেবেন না এটা বছরের পর বছর চলতে পারে না’

ওয়াশিংটন প্রবাসী ভোটার যোশেফ কেনেডি গোমেজ বলেন, বিদ্যমান আইনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেয়া আছে বটে কিন্তু ভোট দেয়ার প্রক্রিয়া এবং আইন কানুন সব জটিল। আমি ভোট দিতে চাই, সেটা তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন? কে কোথায় প্রার্থী হলেন, সেটা আগে চূড়ান্ত হলে তবে তো ভোট দেয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। আগে যুগোপযোগী আইন করা দরকার। দেশে ইভিএমে ভোট নেয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের জন্যও এ রকম ই-ভোটিং ব্যবস্থা করা দরকার।

এ ব্যাপারে প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ সমিতির কো-অর্ডিনেটর ওমর আলী বলেন, প্রবাসী ভোট দিতে ব্যাপকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এটা একটা ভালো দিক। নির্বাচন কমিশন এতকাল বলতো- প্রবাসীরা ভোট দিতে আগ্রহী না, পোস্টাল ব্যালটের জন্য কেউ আবেদন করে না।

তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়ন করা কোনো কঠিন কাজ নয়। এজন্য কোটি কোটি টাকা আলাদাভাবে বরাদ্দেরও দরকার নেই। শুধু নির্বাচন কমিশনের ইচ্ছার দরকার। আমরা আশা করবো সামনে উপ-নির্বাচন আছে, উপজেলা নির্বাচন আছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আছে। প্রবাসীরা যাতে আগামীতে সব নির্বাচনে ভোট দিতে পারে, সেজন্য নির্বাচন কমিশনে আলাদা উইং খুলে পোস্টাল ব্যালটে আবেদনের বিষয়টি তদারকি করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশে এসেছেন। বিভিন্ন দলের কর্মী সমর্থক প্রবাসীরা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিজ নিজ এলাকার আত্মীয় স্বজনকে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে বিদেশে সভা সমাবেশ করেছেন।

এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালটে বিদেশ থেকে ভোট দিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি, গ্রিস, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, সৌদিআরব, ইরান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটের জন্য আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।