প্রকাশ: ০১:২৫:০০ এএম, ০৬ মার্চ ২০১৯
 একজন কৃষকের সন্তান 'উদয় হাকিমের' সাফল্য জীবনের গল্প

সফলতার রহস্যটা আসলে কি? কতটা সংগ্রাম আর পরিশ্রম করে আজ তিনি এতদূর! সফল হবার মূলমন্ত্রটা কি? হাজারো প্রশ্ন নিয়ে মঙ্গলবার (৫ মার্চ) সকাল থেকেই বসে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

নিরাশ করেন নি উদয় হাকিম। জীবনের জানা অজানা অধ্যায়ের কথা অকপটে বলে গেছেন গল্পের ছলে। পিনপতন নিরবতায় মন্ত্রমুগ্ধের মতোন শিক্ষার্থীরা শুনেছে সাংবাদিক থেকে কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা উদয় হাকিমের জীবনের কথা।

আগে ছিলেন পুরোদস্তর সাংবাদিক। খ্যাতি,নাম, ডাক কোন কিছুরই কমতি ছিলো না। যাকে বলে সফল সাংবাদিক। জীবনের নানা বাঁক ঘুরে এখন রীতিমতো কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। এক কথায় সাংবাদিক থেকে দেশ বরেন্য করপোরেট ব্যক্তিত্বদের একজন, তিনি উদয় হাকিম। দেশের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট বলে পরিচিতি ওয়ালটন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’-এর জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের একজন খণ্ডকালীন শিক্ষকতার বাইরে লেখালেখি করেও প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। ৪০টির মতো দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণ বিষয়ে লেখালেখিও করেও পাঠক প্রিয়তা পেয়েছেন তিনি।ইতোমধ্যে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬টি।গীতিকার পরিচয়েও সফল উদয় হাকিম। জীবনমুখী বাংলা গানের অন্যতম শিল্পী নচিকেতা সম্প্রতি উদয় হাকিমের লেখা গান দিয়ে একটি অ্যালবাম করেছেন। নচিকেতার কণ্ঠে ‘ফেসবুক’ নামে একটি জীবনমুখী গান ঝড় তুলেছে ইউটিউবে।

‘সকল পরিচয় ছাপিয়ে আমি কিন্তু একজন কৃষকের সন্তান’ সরলতার মধ্যে সহজভাবে নিজের শেকড়ের পরিচয় দিয়ে চমকে দেন শিক্ষার্থীদের।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বর্ধনপাড়া গ্রামের কাঁদা মাটি থেকে থেকে উঠে আসা মানুষদের একজন আমি। ঢাকা কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়।গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যায়নের সময় থেকেই লেখালেখি। দৈনিক ভোরের কাগজে ফিচার লিখে প্রথম অর্থ উপার্জন।সেই পত্রিকার তখনকার ফিচার সম্পাদক আনিসুল হকের এগিয়ে যাবার উৎসাহ – সবই উঠে আসে উদয় হাকিমের নিজের জবানীতে।

তার পর দৈনিক প্রথম আলো, আমার দেশ, চ্যানেল আই, ২৪ ঘন্টার প্রথম সংবাদ ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএসবি নিউজে কাজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি মেলে ধরেন তিনি।
সিএসবি নিউজ বন্ধ হয়ে গেলো।বেশ বিপাকে পড়লাম।তখনই নিজেকে তৈরি করলাম ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে। নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে চারটি টেলিভিশনের চ্যাঙ্ক ( নির্দিষ্ট সময়) কিনে নিয়ে সেখানে ব্যবসা বানিজ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করতে লাগলাম।আয়টা বেশ ভালোই হচ্ছিলো।

মাঝে দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকাতেও চলতে থাকলো লেখালেখি। ২০১০ সাল। যোগ দিলাম ওয়ালটন গ্রুপে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের ভালোবাসা আর দিক নির্দেশনায় আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। তাঁর একটি কথা আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করলো।

‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। তবে আমি যুদ্ধ করতে চাই দেশের বেকারত্বের বিরুদ্ধে। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেকের দেশের ব্র্যান্ডকে তুলে ধরতে চাই বিশ্ববাসীর দরবারে। সেই যুদ্ধে আমৃত্য পাশে চাই আপনাকে’- ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এমন কথায় বেড়ে গেলো আমাদের কাজের গতি।

এরপর পরিকল্পনা মাফিক আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। লক্ষ্য ছিলো ছয় মাসের মধ্যে বিক্রি দ্বিগুণ করার।কিন্তু সেটা দাঁড়ালো ছয়গুণে।আজ ২০ টির বেশি দেশে ওয়ালটনের পণ্যে লেখা থাকে সত্যিকার মেড ইন বাংলাদেশ। দেশের পণ্য।
আগে জাহাজ ভরে ইলেকট্রনিক্স পণ্য আসতো।এখন উল্টো জাহাজ ভরে বাংলাদেশের পণ্য যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সাশ্রয় হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।দেশের বাজারে আজ ৮০ ভাগই ওয়ালটনের দখলে। আমেরিকা, ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে আমরা নতুন বাজার সৃষ্টি করছি।

আমাদের লক্ষ্য, সবচাইতে সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা ফ্রিজ আমরা বিশ্ববাসীর হাতে তুলে দিয়ে চমকে দেবো। দেখিয়ে দেবো বাংলাদেশ পারে। দিন যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের বিশালতা যেমন বাড়ছে তেমনি কর্ম সংস্থান সৃষ্টিতেও এগিয়ে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জায়ান্ট ওয়ালটন’।

নিজের মেধা আর দক্ষতার জোরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে একের পর এক সাফল্যের পালক।সম্প্রতি ওয়ালটনের ডেপুটি নির্বাহী পরিচালক থেকে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন বাংলাদেশি ব্র্যান্ড ওয়ালটনের নির্বাহী পরিচালক।

উদয় হাকিম স্মরণ করিয়ে দিলেন,আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তাদের হতে হবে অল রাউন্ডার।মনের ভেতর রাজ্য তৈরি করে মনে করতে হবে সেই রাজ্যের রাজা আপনি নিজে।এও স্মরণ করিয়ে দিলেন পুরণো ধ্যান ধারণায় চাকরি নয়,বরং নিজেকে গড়ে তুলতে হবে উদ্যোক্তা হিসেবে।

সাংবাদিকতা পড়েও যে কাজের বহু ক্ষেত্র অপেক্ষা করতে- সেটাও স্মরণ করিয়ে বলেন,একটি লক্ষ্য বেশি মনে রাখা খুবই জরুরী সেটা হলো ধনী হবার চাইতে সুখী হওয়া।কারণ প্রাচুর্য্যের মাঝে সুখ নেই। পেইন না গেইন সেটা নির্ধারণ করতে হবে সবার আগে।সুখ চান না প্রাচুর্যতা চান- সেটাও বেছে নেয়া জরুরী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান উজ্জল কুমার মন্ডলের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বিভাগের মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন,সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক শেখ আদনান ফাহাদ ও ওয়ালটন গ্রুপের অতিরিক্ত পরিচালক মিলটন আহমেদ। অনুষ্ঠান শেষে রাজিবুল হাসান রাহান নামের একজন শিক্ষার্থী জানান,উদয় হাকিম সাংবাদিকতা থেকে আজ এতদূর এসেছে- তার নিজের মুখে সাফল্যের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হলাম।

তিনি সত্যিকারের সফল হবার মন্ত্র শুনিয়ে গেলে। ইসরাত জাহান এমি নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান,সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়ে অনেকেই ভিন্ন পেশায় যাবার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।কেউ বা বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরির স্বপ্ন-ও দেখেছেন। কিন্তু উদয় হাকিমের জীবনের গল্প তাঁর মূল্যবোধ অনেককে প্রভাবিত করবে। আমি নি:সন্দেহে এটা বলতে পারি,তিনি আমাদের মাঝে এসে সাফল্যের আলো ছড়িয়ে গেলেন। বদলে দিয়ে গেলেন আমাদের মতো অনেক শিক্ষার্থীর ধ্যান ধারনা।