logo
প্রকাশ: ০৭:৫৯:০০ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০১৯
আইপিওর মাধ্যমে পুঁজি উত্তোলনের চেয়ে বেশি উত্তোলন প্লেসমেন্টে

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে গত তিন বছরে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছে ২৮ কোম্পানি। কোম্পানিগুলো আইপিও প্রক্রিয়া যত মূলধন সংগ্রহ করেছে, এর বেশি মূলধন সংগ্রহ করছে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে। 

আইপিওর আগে মালিকপক্ষ নিজেদের যে শেয়ার বাড়িয়েছেন, তা বিবেচনায় নিলে আইপিওর আগেই কোম্পানিগুলোর মূলধন গড়ে সোয়া দুইগুণ বেড়েছে। একই চিত্র মিলেছে আইপিও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অন্তত ২৫ কোম্পানির ক্ষেত্রে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে আইপিওতে আসা ২৮ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন আইপিও অনুমোদনের সময় ছিল দুই হাজার ৭৩ কোটি টাকা। এর তিন বছর আগে এগুলোর মূলধন ছিল মাত্র ৬৪৫ কোটি টাকা। আর আইপিওতে কোম্পানিগুলো ৭৩২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট মূল্য পদ্ধতিতে আইপিও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ১৫ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন গত দুই থেকে পাঁচ বছরে বেড়ে ৯৮০ কোটি টাকা হয়েছে, এর আগে যা ছিল মাত্র ২৪৪ কোটি টাকা। এসব কোম্পানির ৬১৬ কোটি টাকা মূলধন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি থেকে। যদিও আইপিও প্রক্রিয়ায় ৪০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের আবেদন করেছে কোম্পানিগুলো।

অন্যদিকে বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় মূলধন সংগ্রহের আবেদন করা ১০ কোম্পানির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৮৯৩ কোটি টাকা, যা তিন বছর আগেও ছিল ৪৭৫ কোটি টাকা। এসব কোম্পানি প্রিমিয়ামসহ এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের অনুমতি চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে আবেদন করেছে।

এসব কোম্পানির কয়েকটির মালিকপক্ষও স্বীকার করে, প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত মূলধনের অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হয়নি। অবশ্য কয়েকটি কোম্পানি জানিয়েছে, এ অর্থ তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে খরচ করেছে।

সম্প্রতি তালিকাভুক্ত এসএস স্টিলের পরিশোধিত মূলধন ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। পরের বছর তা ২২০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানান, প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় তার কোম্পানি ২১০ কোটি টাকার মূলধন বাড়িয়েছে। এর ১১০ কোটি টাকা এইচএসবিসির ঋণ পরিশোধে ব্যবহার হয়েছে। এ ছাড়া তালিকাভুক্তির আবেদনের সময় মালিকপক্ষের ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে তারা আরও কিছু শেয়ার নিজেদের নামে নেন বলে জানান তিনি।

এদিকে স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্র জানিয়েছে, যেসব বিনিয়োগকারী আইপিওর আগে প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনেছিলেন, মালিকপক্ষ এবং তাদের নিকটজন ও অন্যরা এসব শেয়ারের বড় অংশই লক-ইন (শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা সময়) শেষে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মূলধন সংগ্রহ নয়, বরং ব্যক্তিগত মুনাফার স্বার্থে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে অনেক কোম্পানি।

এমন মন্তব্যকে সমর্থন করে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান বলেন, আইপিওতে আসার আগে ও পরে দুই অবস্থাতেই মালিকপক্ষ শেয়ার বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের মুনাফা করছেন। প্লেসমেন্ট শেয়ার থেকে বড় মুনাফা করতে নামমাত্র শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মালিকরা কোম্পানির ব্যবসা বাড়াতে নয়, নিজেদের সম্পদ বাড়াতে শেয়ারবাজারে আসছেন।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ড্রাগন সোয়েটার থেকে শুরু করে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে ২৫ কোম্পানি। আইপিও প্রক্রিয়ায় মূলধন সংগ্রহ শেষে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় আছে আরও তিন কোম্পানি নিউ লাইন ক্লোথিং, এস্‌ক্যোয়ার এবং সিলকো ফার্মা। এগুলো প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে ৮৪৩ কোটি টাকার এবং আইপিওতে বিক্রি করেছে ৭৩২ কোটি টাকার শেয়ার।

পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে, আইপিও অনুমোদনের শর্ত হিসেবে আইপিও পরবর্তী মালিকপক্ষের নূ্যনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতাও কোনোভাবে পূরণ করেছে কোম্পানিগুলো। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত এসকে ট্রিমস, কাট্টলী টেক্সটাইল, ইন্ট্রাকো, ইয়াকিন পলিমার, নিউ লাইন ক্লোথিং, ফরচুন সুজ এবং প্যাসিফিক ডেনিমের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মালিকানার অংশ ৩১ শতাংশের নিচে।

জানতে চাইলে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় অনুষদ বিভাগের ডিন মোহাম্মদ মূসা বলেন, আইনের মধ্যে থেকেই সবচেয়ে বড় অনৈতিকতার চর্চা চলছে। সারা জীবনে কোম্পানি চালিয়ে মালিকদের ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করা সহজ বিষয় নয়। অথচ শেয়ারবাজারে এসে পাঁচ বছরেই কয়েকশ' কোটি টাকার ব্যবসা করার সুযোগ আছে, তখন তারা সেটিই নিচ্ছেন। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও শেয়ারবাজারের সার্বিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

সম্পাদক: সাইফুল ইসলাম অফিস ঠিকানা: ৪০ নর্থ রোড, ভুতের গলি, ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৫। মোবাইল: ০১৭৭৬৪১৪২৪৬, ইমেইল: [email protected]